
দেশজুড়ে ভয়াবহ সার সংকটে দিশেহারা কৃষক সমাজ। মাঠে চাষাবাদের মৌসুম, অথচ কৃষকরা পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় TSP ও DAP সার। কোথাও সার বিক্রি বন্ধ, কোথাও অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন—দেশে কোনো সার সংকট নেই! বাস্তব আর মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য যেন দুই ভিন্ন পৃথিবী।
চলতি বছর সার আমদানিতে অব্যবস্থাপনা, বিলম্ব আর G-2-G নামে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি তলানিতে। মাঠপর্যায়ের অভিযোগ—যেসব আমলারা সার সরবরাহের সিদ্ধান্তে আছেন, তারাই পরিকল্পিতভাবে সংকট তৈরি করে মুনাফা তুলছেন কোটি কোটি টাকা।
‘G-2-G’ নামের ফাঁদ: সরকারি পর্যায়ে ‘Government to Government’ বা G-2-G চুক্তি মানে সাধারণত দুই সরকারের মধ্যে সরাসরি লেনদেন। কিন্তু এখানে বিষয়টা উল্টো। চীনা সরকারের পরিবর্তে বিভিন্ন বেসরকারি ট্রেডিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে, যারা নিম্নমানের সার ভালো সারের সঙ্গে মিশিয়ে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে—প্রতি টনে ২০ থেকে ২৫ ডলার কমিশন খেয়ে এই সিন্ডিকেট সার আমদানির চুক্তি দিচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যয়ে সরকারের ক্ষতি ১১৫ কোটি টাকার বেশি : কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা আর বিলম্বে সরকারকে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। বিএডিসি এই বছর ১২০,০০০ মেট্রিক টন DAP সার চীন থেকে ও ৩০,০০০ মেট্রিক টন TSP সার তিউনিসিয়া থেকে G-2-G চুক্তিতে কিনছে। এই চুক্তিগুলোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় টনপ্রতি ৬০-৭০ ডলার বেশি। হিসাব করে দেখা গেছে—সরকারের বাড়তি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। টেন্ডারে বিলম্ব, লোডিংয়ে স্থবিরতা: বেসরকারি আমদানিকারকদের টেন্ডার আহ্বান দেরিতে হওয়ায় বাজারে সারের দাম হঠাৎ বেড়ে যায় প্রতি টনে ২০০ ডলার পর্যন্ত। ফলে সরকারের অতিরিক্ত খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, তিউনিসিয়া থেকে TSP আমদানিতে দায়িত্ব পাওয়া মেসার্স বঙ্গ ট্রেডার্স এখনো জাহাজ পাঠায়নি। প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও তিউনিসিয়া পোর্টে কোনো জাহাজ নেই। এতে করে দেশের সার সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সার আমদানিতে দ্বৈতনীতি: G-2-G চুক্তিতে যেখানে প্রতি টন DAP সারের খরচ পড়ছে ৮৮৭.২৫ ডলার, সেখানে বেসরকারি আমদানিকারকদের আমদানি মূল্য বেঁধে দেওয়া হচ্ছে ৮৪৮ ডলার। অর্থাৎ সরকারি চুক্তি বেসরকারির চেয়ে টনপ্রতি ৪০ ডলার বেশি।
সার সংকটের ছায়া মাঠে-ঘাটে: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা সার না পেয়ে রাস্তায় নেমেছেন। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও কৃষি অফিস ঘেরাও। অথচ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন—সব ঠিক আছে! বাস্তবতা হলো, সময়মতো সার না পেলে কৃষি উৎপাদন ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটে হাত দিচ্ছে না কেউ: মন্ত্রণালয় ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে এলসি অনুমোদন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেটের হাতেই বন্দী কৃষি উৎপাদনের ভবিষ্যৎ। এখন প্রশ্ন—সরকার কি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে, নাকি কৃষকদের চোখের জলই সার হয়ে গড়িয়ে পড়বে জমির মাটিতে?