
লেখকঃ সাংবাদিক এস,এম উজ্জ্বল হোসেন
স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন শুরু হলে ১৬ই জুলাই সারাদেশ থেকে যখন খবর আসতে লাগলো ছাত্র আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক তখনই জানতে পেলাম রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ নিহত হয়েছে। সেই খবরে সারাদেশে ছাত্রদের মাঝে প্রতিবাদের ঝড় শুরু হয়। যশোর জেলা পরিষদ কালেক্টরি ভবনের সামনে দড়াটানা মোড়ে কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা যখন খুনি হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগানে উত্তাল। ঠিক তখনই পুলিশ লাঠিসোঁটা দিয়ে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তবুও ছাত্ররা থেমে যায়নি, পুনরায় আন্দোলন চলমান রাখে। ছাত্রদের আহত হওয়ার সংবাদ আমাকে আর স্থির রাখতে পারেনি ঠিক ঐ সংবাদটি আমার পত্রিকায় প্রকাশ করি। ১৯ জুলাই শুক্রবার বনশ্রীর বাসা থেকে বের হয়ে ফরাজী হাসপাতালের সামনের রাস্তায় এসে দেখতে পেলাম ২০/২১ বছরের একটি ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় ভ্যান গাড়িতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। ফরাজী হাসপাতালে চিকিৎসা করার জন্য কিন্তু ফরাজি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় তাদের কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে কোনো গুলিবিদ্ধ আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার জন্য। গায়ে বুলেটের আঘাতে রক্তাক্ত দেহ ছেলেটি নিথর দেহ নিয়ে পড়ে আছে,সেখানেই তার মৃত্যু হয়। পাসে কান্না করছে তার আপনজনেরা। এই দৃশ্য দেখে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলামনা। আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে একাত্মতা স্বীকার করে রাজপথে নেমে পড়লাম।রামপুরা থানার সামনে প্রচন্ড গোলাগুলি চলছে অনেকেই বলেছে ওদিকে যাওয়া যাবেনা কিন্তু মন তো আর মানেনা এগিয়ে গেলাম, যেতেই দেখি ১৫/১৬ বছরের একটি ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে তাকে ধরাধরি করে ফরাজি হাসপাতালের ঠিক পাসেই আরেকটি হাসপাতাল রয়েছে সেখানে তার চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসলাম। কিন্তু সেখানে এতো আহতদের চাপ ডাক্তার নার্স কেউ সামলাতে পারছে না তাই দ্রুত অন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা কিন্তু ছেলেটিকে সেখানেই চোখের সামনে মৃত্যু বরন করতে দেখলাম। পরপর আরো কয়েকটি গুলিবিদ্ধ আহত ছাত্রদের রক্তাক্ত দেহ আসলেও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।সেই মুহুর্ত গুলো খুবই ভয়ানক হৃদয় বিদারক, শুধু মনে হচ্ছিল যারা এভাবে রাষ্ট্রের অস্ত্র দিয়ে রাজপথ, আকাশ পথ ব্যবহার করে গুলি নিক্ষেপ করছে তারা কি করে এই দেশের মানুষ হতে পারে?আর এসব অস্ত্রধারীদের পেছনে যিনি হুকুম দিচ্ছেন তিনি কি আমাদের প্রধানমন্ত্রী? মানবতার মা? শেখ মুজিবের মেয়ে? এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। সে কি করে এমন রাক্ষসী তান্ডব চালাতে পারে? ১৯ তারিখ ছিলো খুনি হাসিনার হুকুমে দেশের সামরিক বাহিনীর পৈশাচিক তান্ডব। শত শত মায়ের বুক খালি করেছে এই পাষন্ড বাহিনী। জনগণের টাকায় পালিত পুলিশ বিজিবি RAB যারা এই দেশেরই সম্পদ অথচ তারা একজন মানুষের ক্ষমতা ধরে রাখতে রাক্ষস হয়ে গিয়েছিলো সেদিন। ছাত্ররা ভেবেছিলো এই মানুষগুলো আমাদের বুকে হয়তো গুলি করবেনা কিন্ত সব ভাবনার অবসান ঘটিয়ে ৭১এর কালো রাতকেও হার মানালো এই হায়েনার দল। সারাদেশের সাধারণ ছাত্র জনতার ওপর এমন বর্বরোচিত হত্যা এটা কোনো সভ্য দেশের মানুষ মেনে নিতে পারেনা? এটা ভেবে প্রায় হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম। গত ১৬ বছরের অপশাসনের বিরুদ্ধে কিছুটা ভুমিকা রাখতে নিজেকেও অংশীদার করে নিলাম। বনশ্রীর বাসা থেকে বের হয়ে সাহসী বীর সন্তানদের পাসে দাড়িয়ে সমস্বরে স্লোগান আর স্লোগান। স্বৈরাচার নিপাত যাক, আমার দেশ তোমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ, দিল্লি না ঢাকা?ঢাকা ঢাকা। আমি কে তুৃমি কে রাজাকার রাজাকার কে বলেছে, কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার। এসব স্লোগানের মধ্যে দিয়ে শেখ হাসিনা হয়ে উঠলেন স্বৈরাচার খুনি হাসিনা। জুলাই আন্দোলন আর একক আন্দোলন রইলোনা, এটি একটি জাতীয় আন্দোলনের রুপ নিয়েছে। কোঠা আন্দোলন থেকে শুরু করে সরকার পতনের আন্দোলন, রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠেলো। সরকারের মারমুখী আচরণে ছাত্রদের দেহ রক্তাক্ত হতে লাগলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ,রামপুরা,বাড্ডা, ব্রাক ইউনিভার্সিটি, আফতাব নগর, আইইউবি ইউনিভার্সিটি, নতুন বাজার,নর্দ্দা বসুন্ধরা যমুনা, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি সহ মোহাম্মদপুর,উত্তরা,বিএনএস টাওয়ার, আব্দুল্লাহপুর, অন্যদিকে যাত্রাবাড়ি, শনির আকড়া,নারায়ণগঞ্জ সহ সারাদেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনে লক্ষ লক্ষ ছাত্র জনতার ঢল।এছাড়া সারাদেশের সরকারি বেসরকারি স্কুল কলেজের সাধারণ মানুষ একযোগে ঢাকা মুখি রওয়ানা এসব দেখে স্বৈরাচার সরকারের প্রধান আতংকে বহু ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করেও নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ১৬ জুলাই থেকে ৬ আগষ্ট (৩৬জুলাই) পর্যন্ত পুলিশ বিজিবি ছাত্রদের ওপর ভারী অস্ত্র ও হেলিকপ্টারে করে নির্দ্বিধায় গুলি,কাদানী গ্যাস নিক্ষেপ করে আমার দেশের সাহসী সন্তানদের হত্যা করেছে। যার হুকুম খুনি হাসিনা নিজেই দিয়েছে তার বহু প্রমান এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে রক্ষিত রয়েছে যে তথ্য দিয়ে বিচার কাজ চলমান রয়েছে। নাম না জানা বহু মানুষের মাঝে আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান (মীর মুগ্ধ).শেখ আশাবুল ইয়ামিন, মোঃ ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত, তাহির জামান প্রিয়ো, রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ, ফারহান ফাইয়াজ,ইমরান খলিফা, মোহাম্মদ শাহিদ, মাহমুদুর রহমান সৈকত, নাসির হোসেন সহ (যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিতে নিহত ২০ জনের অধিক। সারাদেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৪০০শ ও ৪০ হাজারের বেশি মানুষ আহত। অবশেষে এসব হত্যার হুকুম দাতা ভারতের পরামর্শে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও সেনা প্রধান ওয়াকারুজ্জামান এই দুই মীর জাফরের সহযোগিতায় দেশ ছেড়ে পালাতে সক্ষম হয়। এছাড়া তাদের দোসররাও ওয়াকারের সহযোগিতায় ক্যান্টনমেন্টে গা ঢাকা দিয়ে পালাতে সুযোগ পেয়ে যায়। এদায় একমাত্র হাসিনার দোসর সেনাপ্রধান ওয়াকার ও রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর।স্বৈরাচার সরকারের দোসরদের অনেকেই সাধারণ মানুষের হাতে আটক হয়ে ধরা পড়েছে, তারা এখন বিচারের সম্মুখীন। দেশে এখন অন্তর্বর্তী (ইন্টোরিম) সরকার তার প্রধান ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস, ছাত্র প্রতিনিধিরাও রয়েছে সেই সরকারে, এছাড়া সুকৌশলে পলাতক স্বৈরাচার সরকারের দোসররাও সরকারের অভ্যান্তরে রয়ে গেছে। যে কারনে দেশ গঠনে অনেক সিদ্ধান্তই বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে।এদিকে জাতীয় পাটি দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী সরকারের অবৈধ নির্বাচনের অংশীদার হয়েও আগামী নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে যা নিন্দনীয় ও দুঃখ জনক। এছাড়া বিএনপি নামক দলটির মধ্যেও রয়েছে ভারতের গুপ্তচর নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের পথে থাকার কৌশল অবলম্বন করছে। রাষ্ট্রীয় সংবিধান সংশোধন, জুলাই সনদে বাঁধা, বিচার ব্যবস্থায় বাঁধা সহ নানাবিধ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদান ও রাজপথে থাকার কারনে আমাকে ৩১/৭/২০২৪ দুপুর আনুমানিক ২.০০ ঘটিকার সময় ডিজিএফআইয়ের একটি সিভিল টিম রেস্টুরেন্ট থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায়।আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি আমাকে কেনো অপহরণ করা হচ্ছে কিন্তু এটা বুঝতে পেরেছিলাম আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ধারনা করেছিলাম ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে সম্ভবত এনটিএমসি’র একটি ভবনে নেওয়া হচ্ছে যেখানে ছোটো ছোটো ঘর ছিলো। ঘরটি ৩ফিট/৬ফিট হবে। যেটাকে পরবর্তীতে জেনেছি আয়নাঘর। ঐ ঘরের মধ্যে আমাকে দুদিন চোখ হাত বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছিল। আয়না ঘরের সেই ভয়ানক লোহার চেয়ারে বসতে বাঁধ্য করে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে? কেনো ছাত্রদের পক্ষে নিউজ করেছি?কেনো ছাত্রদের সাথে আন্দোলনে নেমেছি? কেনো ছাত্রদের সাহায্য করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশেষে আয়না ঘরের লোহার চেয়ার থেকে সরিয়ে আমাকে একটি সাধারণ টুলে বসিয়ে মুচলেকা লিখতে বলে। আমি লিখেছিলাম ৩১/০৭/২০২৪ইং তারিখ বেলা আনুমানিক ২.০০ ঘটিকার সময় রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খাচ্ছিলাম ততমুহুর্তে গোয়েন্দা সংস্থার একটি সিভিল টিম আমার হাত ও চোখ বেঁধে সাদা একটি মাইক্রোবাস যোগে তুলে নিয়ে আসে। আমার জানামতে দেশের ক্ষতি সাধিত হয় এমন কোনো কাজ করিনি বা অদুর ভবিস্যতে রাষ্ট্র সমাজ বিরোধী কোনো কর্মকান্ডে জড়িত হবোনা মর্মে অঙ্গীকার করিলাম। এছাড়া আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সত্য নহে। তবুও আনিত অভিযোগের সাথে জড়িত হবোনা মর্মে স্বীকার করিলাম। মুচলেকাটি রেডি করে দেওয়ার পর অনেক যাচাই বাছাই করে মিলিটারি পুলিশ (এমপি)দের কড়া নিরাপত্তায় অন্য একটি জঙ্গলসম এলাকার একটি পুরনো ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে ভিডিও সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছে। অতঃপর সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় আমাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অনধিকার প্রবেশ কথাটি উল্লেখ করে থানায় সোপর্দ করা হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনাব আলিম সাহেব বিষয়টি বুঝতে পেরে আমাকে সামান্য ডিএমপি এক্ট এর একটি মামলা দিয়ে কোট হাজতে পাঠিয়ে দেয়। নামমাত্র জরিমানা দিয়ে মুক্ত হই। আল্লাহর অশেষ কৃপায় ঐ অন্ধকূপ থেকে রক্ষা পেয়েছি (আলহামদুলিল্লাহ)। মুক্ত হয়ে নতুন একটি দেশ পেয়েছি আশা করি ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস এর নেত্রীত্বে এজাতী একটি স্বনির্ভর দেশ পাবে, ইনশাআল্লাহ।