
নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যার এক বিশ্লেষণে সাময়িকীটি এই পূর্বাভাস দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, খ্যাতনামা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের ক্ষেত্রে শীর্ষ দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট উল্লেখ করে, ১৮ মাস আগে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই হবে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। সে সময় ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। সাময়িকীটি ওই সময়কালকে দমন-পীড়ন ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে এবং ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক মেরামতের সূচনা করতে পারে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য বিজয়ের পূর্বাভাস এর আগেও টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। দ্য ইকোনমিস্ট প্রতিবেদনে ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার দৃশ্য তুলে ধরে জানায়, বুলেটপ্রুফ বাসে করে ঢাকায় প্রবেশের সময় উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের ভিড়ে বাসটি কয়েক মাইল ধীরে চলেছিল—যেন জনতা কাছ থেকে তাকে একনজর দেখতে পারে।
সাময়িকীটি দাবি করে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে আনুমানিক ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস)-এর গবেষণা পরিচালক শাফকাত মুনিরের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, “আমার জীবনের প্রায় দুই দশক ধরে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।” তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রাজধানীর রাস্তায় আবারও নির্বাচনী প্রচারের চিত্র ফিরে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধানই হবে শেষ দায়িত্ব। তবে অধিকাংশ মানুষের মতে, সরকারটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমাবে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—নতুন উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা। জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, দলটি ‘সব নাগরিকের জন্য সংযত শাসনের’ প্রতিশ্রুতি দিলেও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে তাদের অগ্রগতি উদ্বেগ তৈরি করছে। দলটি এবারের নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি এবং সংসদীয় অভিজ্ঞতাও সীমিত। এই প্রেক্ষাপটকে তারেক রহমানের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে সাময়িকীটি, কারণ সাম্প্রতিক জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন বিএনপি পরিচালিত হয়েছে তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। তার আগে দলটির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। তারেক রহমান এখনও বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি, পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং প্রতিবছর পাঁচ কোটি গাছ লাগানো।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ট্রাম্প একজন বাস্তববাদী ব্যবসায়ী হওয়ায় তার সঙ্গে কাজ করতে তার কোনো সমস্যা হবে না।
দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, তারেক রহমানের মতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। তিনি ২০২৪ সালের বিক্ষোভে নিহতদের জন্য বিচার দাবি করলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার না করার অঙ্গীকার করেছেন। তারেক রহমানের ভাষায়, ২০২৪ সালের বিপ্লব প্রমাণ করেছে, যেসব সরকার জনগণের জন্য কার্যকর কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হয়, তাদের পরিণতি কী হতে পারে। প্রতিশোধের রাজনীতি কারও জন্যই কল্যাণকর নয়।