
নিজস্ব প্রতিবেদক | অভয়নগর (যশোর)
যশোরের অভয়নগর উপজেলায় ভুল আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্টের কারণে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নড়াইল জেলা সরকারি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল গফফার, যিনি একই সঙ্গে নিজস্ব এ. হামিদ মেমোরিয়াল (প্রাঃ) হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করেন। ভুল রিপোর্টে যমজ সন্তানের বিষয়টি গোপন থাকায় প্রসবকালীন জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি নবজাতকের প্রাণহানি ঘটে বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন সানজিদা আক্তার দোলা (১৬)। তবে সন্তান জন্মের পর প্লাসেন্টা (ফুল) বের করার সময় নার্সরা দেখতে পান—গর্ভে আরও একটি সন্তান রয়েছে। দ্বিতীয় নবজাতকের অবস্থান ছিল অস্বাভাবিক। অনেক চেষ্টার পর তাকে বের করা হলেও সে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রসূতি ও তার স্বজনেরা কেউই আগে জানতেন না যে তিনি যমজ সন্তানের মা হতে চলেছেন। নিহত নবজাতকের মা সানজিদা আক্তার দোলা যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া ইউনিয়নের ডাঙ্গা মশিয়াহাটি গ্রামের তাজিমুল ইসলামের স্ত্রী।
ভুল রিপোর্টই কাল হলো?
প্রসূতির স্বামী মো. তাজিমুল ইসলাম জানান, প্রায় এক মাস আগে নড়াইল জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল গফফারের নিজস্ব এ. হামিদ মেমোরিয়াল হাসপাতালে আল্ট্রাসনোসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হয়। সেখানে রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল—গর্ভে একটি সন্তান রয়েছে এবং সম্ভাব্য ডেলিভারি তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি বলেন, আমি তো রিপোর্ট বুঝি না। ডাক্তার বলেছিলেন সব ঠিক আছে, একটি সন্তান। যদি আগে জানতাম যমজ সন্তান, তাহলে নিশ্চয়ই বাড়তি সতর্কতা নিতাম। আমার সন্তানের মৃত্যু হতো না। অভয়নগর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও সহকারী সার্জন ডা. মো. ইকবাল হোসেন জানান, রোগী ও তার পরিবার কেউই জানতেন না যমজ সন্তান রয়েছে। রোগীর অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। জরায়ু পুরোপুরি খুলে যাওয়ায় দ্রুত প্রসব করানো হয়। দ্বিতীয় নবজাতক মৃত পাওয়া যায়। ভুল আল্ট্রাসনো রিপোর্ট এ ঘটনার একটি বড় কারণ বলে মনে হচ্ছে। অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. আলিমুর রাজিব বলেন, এ বিষয়ে এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নড়াইল জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল গফফার বলেন, মেডিকেল সেক্টরে শতভাগ নির্ভুলতা সব সময় সম্ভব হয় না। ভুল হতে পারে। রিপোর্ট লেখা বা দেখার সময় ভুল হয়ে থাকতে পারে। তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডা. আবদুল গফফারের বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ১২ মে নড়াইল সরকারি হাসপাতালের সামনে তার অপসারণ দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করে এলাকাবাসী। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন। তার ডায়াগনস্টিক সেন্টারটির আগের নাম ছিল ‘ডক্টর ক্লিনিক’, যা অনিয়মের কারণে একসময় বন্ধ করে দেয় সিভিল সার্জন কার্যালয়। পরে নাম পরিবর্তন করে পুনরায় কার্যক্রম চালু করা হয়।
এ ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের ভাষায়,
“এরা মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণ ঝরবে।”