
বিশেষ প্রতিনিধি
অভয়নগর উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়নের মথুরাপুর পুড়াখালি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও দিঘীরপাড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসায় ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন তহবিলের আওতায় ডাবল বেঞ্চ সরবরাহ প্রকল্পে গুরুতর অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা(সচিব) সজল মজুমদার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধি অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন বাধ্যতামূলক এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যকে পিআইসি করার নিয়ম থাকলেও এ প্রকল্পে তা অনুসরণ করা হয়নি। বরং অন্য ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যদের দিয়ে নামমাত্র পিআইসি দেখিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্প অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০ জোড়া করে মোট ৪০ জোড়া ডাবল বেঞ্চ সরবরাহের কথা ছিল। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ধরা হয় ২ লাখ টাকা করে, দুই প্রতিষ্ঠানে মোট বরাদ্দ ৪ লাখ টাকা।
তবে একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনি কর্মকর্তা সজল মজুমদার নিজে শংকরপাশা এলাকার ‘মা ফার্নিচার’ দোকান থেকে অনেক কম খরচে নিম্নমানের ডাবল বেঞ্চ তৈরি করিয়ে তা সরবরাহ করেন। এতে প্রকল্পের বাকি অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শংকরপাশা এলাকার ‘মা ফার্নিচার’ প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. সজিব মুন্সী জানান, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব গ্রাম পুলিশ দিয়ে তাকে ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে নেন। সেখানে ৪০টি ডাবল বেঞ্চ তৈরির খরচ জানতে চাইলে তিনি ১ লাখ টাকা হলে তৈরি করে দিতে পারবেন বলে জানান। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে ৭৪ হাজার টাকায় মৌখিক চুক্তি হয় আমার সাথে। কাজের শুরুতে ৪৫ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয় এবং বাকি টাকা কাজ শেষে কয়েকদিন পর নগদে পরিশোধ করেন। তিনি আরও বলেন, “আমাকে ৬ ফুটের ২০টি ও ৪ ফুটের ২০টি বেঞ্চ বানাতে বলা হয়েছিল, আমি সেভাবেই তৈরি করেছি।
মথুরাপুর পুড়াখালি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, “এ বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। একদিন ইউনিয়ন পরিষদের সচিব জানালেন, স্কুলের সামনে ভ্যানে করে বেঞ্চ এসেছে নামিয়ে নিতে। শিক্ষার্থীদের বসার সমস্যা থাকায় বেঞ্চ পেয়ে ভালোই লেগেছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে সাবেক প্রধান শিক্ষক ভালো বলতে পারবেন।”
দিঘীরপাড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষক জামিরুল ইসলাম বলেন, “সরকারি টাকায় মানসম্মত বেঞ্চ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যেগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের উপযোগী নয়।” তিনি আরও বলেন, “পরে জানতে পারি এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ টাকা। অথচ যে কাঠ দিয়ে বেঞ্চ তৈরি করা হয়েছে, তার মূল্য ৩০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তাহলে বাকি টাকা কার পকেটে গেল তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তার একক নিয়ন্ত্রণ, পিআইসি গঠনে অনিয়ম এবং সরাসরি ফার্নিচার তৈরি করিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বরাদ্দের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) সজল মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সব কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে।” তবে তিনি স্বীকার করেন, বেঞ্চ তৈরিতে তিনি সহযোগিতা করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের পিআইসিদের নামে উপজেলা পরিষদ থেকে ইস্যুকৃত ব্যাংক চেক তিনি সংগ্রহ করেন এবং পিআইসিদের কাছ থেকে আগেই তাদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবের চেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল। তবে ৪ লাখ টাকার বরাদ্দের বিপরীতে ৭৪ হাজার টাকায় বেঞ্চ তৈরির অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল উপজেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।