
স্টাফ রিপোর্টার:
মাত্র তিন বছর বয়সে বাবার সঙ্গে খুলনায় এসেছিলেন মোঙু রাউত (৬৫)। ছয় দশকের জীবনে তিনি পাঁচবার ঘর হারিয়েছেন। বর্তমানে ১৭ বছর ধরে নগরীর ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় গ্রীণল্যান্ড বস্তির রেলের জমিতে পরিবারসহ বসবাস করছেন। নিত্য অভাব, বঞ্চনা ও ঋণের বোঝা নিয়ে কষ্টের জীবন কাটছে তার।
মোঙু রাউত জানান, রেলের কাজের সূত্রে বাবার সঙ্গে প্রথমে লোকোসেড এলাকায় আশ্রয় পেয়েছিলেন। পরে নিক্সন মার্কেটের পিছনে ঘর কিনে বসবাস শুরু করেন, কিন্তু দু’বার ঘর ভেঙে যায়। এরপর ভাড়া বাসায় চলে যান, কিন্তু সেখানে বেশি দিন থাকতে পারেননি। তিনি বলেন, “এমন জীবন যেন কারো না হয়। মাসে মাত্র ৮ হাজার টাকার কাজ। দেনাদারদের হুমকিতে বেঁচে থাকা কষ্টকর।”
শুধু মোঙু নয়, খুলনায় দলিত জনগোষ্ঠীর হাজারো পরিবারই অনিশ্চয়তা ও ভাঙা-গড়ার জীবনযাপন করছেন। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় তারা উচ্ছেদ আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা এবং বৈষম্যের শিকার। এদের মধ্যে বাল্যবিবাহ, অনিরাপদ মাতৃত্ব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
গবেষণা অনুসারে, খুলনার বিভিন্ন এলাকায় দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। ঋষিপাড়া, ময়লাপোতা বস্তি, পুলিশ লাইন, বার্মাশীল, নিক্সন মার্কেট, ৫ নম্বর ঘাট, রায়েরমহল জেলেপাড়া—মহানগরীতে সহস্রাধিক পরিবার বসবাস করছে। খুলনার ৩টি উপজেলায় প্রায় ৬,৯৫২টি পরিবার বা ২০,৮৫৬ জন স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এদের প্রধান সমস্যা হলো স্থায়ী বাসস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও বাল্যবিয়ে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে দেখা গেছে, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ৫২% নারী ও কিশোরী নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন, ৭০% মনে করেন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ যথাযথ নয়। বাল্যবিবাহের হার ৫৬%, যৌতুক ৫৫%, অপরিণত বয়সে মাতৃত্ব ৫৬% এবং অনিরাপদ পদ্ধতিতে সন্তান প্রসবের হার ৬৩%।
গবেষক অধ্যাপক মো: মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই গবেষণার লক্ষ্য নারী ও শিশুদের তথ্যপ্রাপ্তি ও নিরাপত্তার বর্তমান স্তর মূল্যায়ন করা। এটি ভবিষ্যতের প্রকল্পের কার্যক্রম প্রণয়ন ও প্রভাব সৃষ্টি করবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, ছোট ঘরে বহুজন বসবাস, কম টয়লেট ব্যবহারের চাপ এবং উচ্ছেদ আতঙ্ক দৈনন্দিন জীবনের অংশ। দলিত জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধি, স্থায়ী বাসস্থান, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিই সমাধানের মূল চাবিকাঠি।
খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো: আক্তার হোসেন জানান, সরকারের খাসজমি বস্তোবস্তের নীতিমালা অনুসরণ করে ভূমিহীনরা উপজেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ নিতে পারেন। প্রশাসন এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।
বেসরকারি সংস্থা ক্রিশ্চিয়ান এইড, আমরাই পারি, ফাউন্ডেশন ফর দ্যা পিপল ইত্যাদি প্রান্তিক ও দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।