
মোঃ কামাল হোসেন,অভয়নগর প্রতিনিধি
তেত্রিশ বছর কেটে গেছে, কেউ কথা রাখেনি সাক্ষাৎকারে হঠাৎ উচ্চারিত এই পঙ্ক্তিটি যেন খুলনা বেতারের কণ্ঠশিল্পী নন্দিতা মল্লিকের অতীতের অমানবিক নির্যাতনের নীরব ভাষ্য। একসময়ের গৃহবধূ, আজকের আত্মমর্যাদাশীল ও স্বাবলম্বী নারী নন্দিতার জীবনযুদ্ধ যেন হাজারো নারীর সাহসের প্রতীক। ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অভয়নগরের সড়াডাঙ্গা গ্রামের সুধাংশু মল্লিকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নন্দিতা। কিন্তু সংসার জীবনের শুরুতেই তার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। গান গাইতে নিষেধ, পড়াশোনায় বাধা, প্রতিনিয়ত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন অসহনীয় এক দমবন্ধ জীবন তাকে গ্রাস করে। প্রত্যেকটি দিন যেন তাকে ভাঙতে চেয়েছে, স্তব্ধ করতে চেয়েছে তার সৃষ্টিশীলতা ও সত্তাকে।
কিন্তু নন্দিতা হার মানেননি। দেড় বছরের বিবাহিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। মনভাঙা, আহত তবুও লড়াই করার অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে নতুনভাবে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে প্রথম শ্রেণীতে মাস্টার্স করা নন্দিতা পেশাগত জীবনেও ছিলেন দৃঢ়। কিশোর-কিশোরী ক্লাব, নড়াইল কালেক্টরেট স্কুল, ব্র্যাকের কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি মুক্তেশ্বরী সংগীত নিকেতন এবং কিশোর-কিশোরী ক্লাবে সংগীত শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আজ ৩৩ বছর বয়সী নন্দিতা মল্লিক নিজের পায়ে দাঁড়ানো এক দৃঢ়চেতা নারী। অতীতের দুঃসহ স্মৃতি তাকে কাঁদায় ঠিকই, কিন্তু ভাঙতে পারে না। বরং তা তাকে আরও শক্ত করেছে, আরও স্বাধীন করেছে। তার অতীতের নির্যাতন আজ তাকে পরিণত করেছে সংগ্রামী এক শিল্পীতে, যার স্বপ্ন সমাজে মানবিকতার আলো ছড়ানো। তার একটি বড় স্বপ্ন একটি প্রবীণ নিবাস প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নিঃস্ব ও একাকী মানুষেরা আশ্রয় পাবেন ভালোবাসা ও সম্মানের।
গানের ভুবনে নিজেকে পুনর্গঠিত করে চলা এই কণ্ঠশিল্পী হয়তো একদিন মঞ্চ মাতাবেন লক্ষ মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু ভুলে যেতে পারবেন না সংসার জীবনে পাওয়া নিষ্ঠুর নির্যাতনের সেই করুণ অধ্যায়।
নন্দিতা মল্লিক আজ কেবল একটি নাম নয়, তিনি প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার আলো।