বিশেষ প্রতিনিধি
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চীনের সঙ্গে জিটুজি (G2G) ভিত্তিতে সার আমদানির চুক্তি ঘিরে ভয়াবহ দুর্নীতির গন্ধ পাওয়া গেছে। সরকারি সংস্থা বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের একদল প্রভাবশালী কর্মকর্তা মিলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ২৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।২০২৪ সালে বিএডিসি চীনের দুটি নির্দিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিএপি সার আমদানির চুক্তি করে। কিন্তু পরের বছর, ২০২৫ সালে, কৃষি উপদেষ্টার স্বাক্ষরে হঠাৎ নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যেখানে চীনের প্রায় সব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া, মাননির্ভরতা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার নিয়ম সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই চুক্তি সম্পন্ন হয় আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ছাড়াই। চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাতটি লটে সার পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু বিএডিসি ইচ্ছেমতো সময় পরিবর্তন করে এমন সময়ে শিপমেন্ট নেয়, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দাম কম থাকলেও তখন কোনো চালান নেয়নি তারা। বরং জুলাই থেকে অক্টোবর যখন দাম চড়ছে তখনই সার আনার তাড়াহুড়া শুরু হয়।চুক্তি অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হওয়ার কথা ছিল ১৮ সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক সূচক (Argus ও Ferticon) ধরে। তখন প্রতি মেট্রিক টনে দাম পড়ত ৭৬৮.৭৫ ডলার। কিন্তু বিএডিসি ইচ্ছেমতো এক সপ্তাহ আগের সূচক ধরে দাম নির্ধারণ করে ৭৭২.৫০ ডলার। এতে শুধু এই লটেই সরকারের ২ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। পরে দেখা যায়, প্রকৃত হিসাব অনুযায়ী দাম হওয়া উচিত ছিল ৭৫৬.২৫ ডলার। অর্থাৎ প্রতি টনে ১৬.২৫ ডলার বেশি দেখিয়ে ৯ কোটি টাকার লুটপাট। ১৫–২১ অক্টোবরের লে-ক্যান অনুযায়ী দাম পড়ার কথা ছিল প্রতি টনে ৭৫৬.২৫ ডলার। কিন্তু আগের উচ্চমূল্য ৭৬৮.৭৫ ডলার বহাল রেখে সিন্ডিকেট আরও ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। লে-ক্যান পরিবর্তনের পর দাম কমে যাওয়ার কথা থাকলেও আগের দামই বহাল রাখা হয়। ফলে সরকার ক্ষতির মুখে পড়ে আরও ৭ কোটি টাকায়।সব মিলিয়ে তিনটি লটেই সরকারের ২৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ সরাসরি লোপাট হয়। আরও ভয়াবহ বিষয় লে-ক্যান ও দাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম থাকলেও বিএডিসি বা কৃষি মন্ত্রণালয় কেউই সেই অনুমোদন নেয়নি। দাম বাড়ানোর অজুহাতে আন্তর্জাতিক সূচক বিকৃত করা, নির্ধারিত ফর্মুলা উপেক্ষা, এবং চুক্তি লঙ্ঘন সব মিলিয়ে এটি নিছক ভুল নয়, বরং একটি পরিকল্পিত সরকারি অর্থ লুণ্ঠনের অপারেশন। এখন প্রশ্ন একটাই চীনের সঙ্গে এই জিটুজি চুক্তি কি সত্যিই কৃষক ও কৃষি খাতের স্বার্থে হয়েছিল, নাকি কিছু প্রভাবশালী মহলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভারী করার জন্য ? দেশ জানতে চায় এই সিন্ডিকেট কারা, আর তাদের পেছনে কারা? রাষ্ট্রের অর্থ কেড়ে নেওয়া এই লুটেরাদের বিরুদ্ধে কবে শুরু হবে সত্যিকারের তদন্ত?