নিজস্ব প্রতিবেদক :::
বরিশালের মুলাদীতে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ঢাল বানিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে মোঃ হাসিব নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। উপজেলার দক্ষিন কাজিরচর গ্রামের হাওলাদার বাড়ির মুজাম্মেল হোসেনের ছেলে হাসিব গত ২৭ মার্চ বরিশাল বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন (যার পিটিশিন মোং নং-১৪২/২০২৫)। মামলায় তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পেটে লাথি মেরে ছয় মাসের গর্ভের সন্তান হত্যার অভিযোগ তোলা হলেও ওই বছরের ৮ মে সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন আখি আক্তার সুমাইয়া।
মামলায় আসামী করা হয়- ওই এলাকার শাহ আলম হাওলাদারের ছেলে জাফর হাওলাদার (২৪), তার মা রাশিদা বেগম (৪৫), মৃত হাছেন হাওলাদারের ছেলে সিরাজ হাওলাদার (৩০), মৃত ইয়াসিন হাওলাদারের ছেলে দুলাল হাওলাদার (৪৬), মৃত জুলফিকার হাওলাদারের ছেলে বাচ্চু হাওলাদার (৪২) ও শাহ আলম ওরফে আলোর মেয়ে সোনিয়া আক্তারসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে।
মামলায় বলা হয়- বিগত ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬ টার দিকে বাদী মোঃ হাসিব এবং তার স্ত্রী আখি আক্তার সুমাইয়া উপজেলার হাওলাদার ব্রিজ সংলগ্ন সরদার বাড়ি ঢোকার পথের পাশে পৌঁছানো মাত্রই আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অস্ত্র লাঠি, লোহার রড, রাম দাও হাতুড়ি সহকারে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এ সময় আখি আক্তার সুমাইয়া গালিগালাজ করতে নিষেধ করলে রাশিদা বেগমের হুকুমে সিরাজ হাওলাদার গর্ভবতী আখি আক্তার সুমাইয়ার পেটে লাথি মারলে রক্তক্ষরণে তার গর্ভপাত ঘটে। তখন রাশিদা বেগম তার জামা কাপড় ধরে টানাহেছড়া করে শ্লীলতাহানি ঘটায়। এ সময় দুলাল হাওলাদার আখির হাতে থাকায় একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এদিকে ওই ৪/৫ নং স্বাক্ষীদের টানাহেছড়া করে শ্লীলতাহানি ঘটায় এবং সিরাজ হাওলাদার ৪ নং সাক্ষীর গলায় থাকা ১ ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। বাচ্চু হাওলাদার এক লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং ৬ নং সাক্ষীর গলায় থাকা একটি চেন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। অন্যদিকে রাশিদা বেগম ও সোনিয়া আক্তার আখিকে চর থাপ্পর মেরে চুলের মুঠি ধরে টানাহেছড়া করে।
এ সময় আখির ডাক চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসলে আসামিরা খুন জখমের ভয়-ভীতি দেখিয়ে দ্রুত দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে আখিকে উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে মামলায় উল্লেখিত ঘটনা নিয়ে এলাকায় ব্যপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মামলার বিবরণে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করায় এলাকাবাসীর মনেও তীব্র ক্ষোভের দেয়া দেয়। বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনার আসল রহস্য উদ্ঘাটনে ছুটে যায় বরিশাল ক্রাইম নিউজের অনুসন্ধানি টিম। সেখানে যেতেই বেড়িয়ে আসে নতুন নতুন অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়- গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬ টার দিকে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। তবে সেখানে আখি আক্তার সুমাইয়া উপস্থিত ছিলেন না। তিনি সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থলে আসেন। এদিকে আখির স্বামী মোঃ হাসিব বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ বরিশাল বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় উল্লেখ করা হয় সিরাজ হাওলাদার গর্ভবতী আখি আক্তার সুমাইয়ার পেটে লাথি মারলে রক্তক্ষরণে তার গর্ভপাত ঘটে। কিন্তু মামলার দুই মাস পর গত বরিশাল নগরীর ফেয়ার হেল্থ ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে সুস্থ কণ্যা সন্তানের জন্ম দেন আখি আক্তার সুমাইয়া। এরপরেও ওই মামলায় পেটে লাথি মেরে সন্তান গর্ভপাতের ঘটনা উল্লেখ করে জবানবন্দি দিয়েছেন আখি আক্তার সুমাইয়া। এদিকে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করে মামলা সাজিয়ে হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়েছে এলাকাবাসী। অন্যদিকে হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পেতে আদালতের বিচারকদের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন ভূক্তভোগী পরিবার।
মামলার বাদী হাসিব বলেন, মামলায় যে ঘটনা উল্লেখ করা আছে সবই সত্যি। মামলায় বেশ কয়েকটি ধারা রয়েছে, এরমধ্যে তদন্তে যে বিষয় উঠে আসবে সে অনুযায়ী আদালত ব্যাবস্থা নেবে।
মামলার ১নং সাক্ষী আখি আক্তার সুমাইয়া বলেন, মামলার এজাহারে আমার গর্ভের বাচ্চা পড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভুলে লেখা হয়েছে। এর কোন সত্যতা নেই। কিন্তু আমার পেটে সত্যিই লাথি মারা হয়েছিল। এজাহারটি লেখার সময় আমি সামনে ছিলাম না, আমি সে সময় ঢাকা ছিলাম। এজাহারটি আমার স্বামী করেছিল।
মামলার ৫নং সাক্ষী সাবু হাওলাদার বলেন, তারা দুই চাচাতো ভাই পৈতিক সম্পত্তি নিয়ে বাক-বিতন্ডার মধ্যে জড়িয়ে পরে কিন্তু সেখানে কোন মহিলা মানুষ ছিল না। আমি দুই পক্ষের হাতা-হাতি ছাড়াতে গিয়ে আমার হাত ভেঙ্গে যায়।
হাসিবের মামাতো ভাই সোহেল হাওলাদার বলেন, বাড়িতে বসে এ হামলার সুত্রপাত হয়। এ বিষয়টি নিয়ে আর সামনে আগানোর দরকার নেই বলে আমি আমার ছেলে অসুস্থ নিয়ে বাজারে চলে যাই। হঠাৎ আমার কাছে ফোন আসলে জানতে পারি তাদের সাথে মারামারি হচ্ছে। তখন আমি ছেলেকে স্ত্রীর কাছে রেখে চলে আসি। এসে দেখি মারামারি শেষ, হাসিব রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তখন হাসিবকে দেখে আখি মাথা ঘুড়ে পড়ে যায়। তখন অপর গ্রুপের কেউ ছিলো না টাচ করবে কি করে। দুপক্ষের ইট পাটকেল ছোড়ায় হাসিবের মা ও দু’পক্ষের লোকজন আহত হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই গোলাম মোস্তফা বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। ওই ঘটনায় বাচ্চার কোনো সমস্যা হয়নি। আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট আমার হাতে রয়েছে।